প্রকৃত সৌন্দর্যের খোঁজে: মিস ডেনমার্ক থেকে শ্রীকৃষ্ণ চরণে

Dvarakajivana Dasa
0


 যোগেশ্বর দাস: অ্যানে স্কফাস, জন্ম একটি সম্ভ্রান্ত ডাচ পরিবারে। মাত্র ছয় বছর বয়সে প্রবেশ করেন ড্যানিশ রয়েল ব্যালেটে এবং দশ বছর সেখানে তার প্রতিভাশৈলী প্রদর্শন করেন। ১৯৬৫ সালে পান মিস ডেনমার্ক উপাধি। এরপর ৬ মাসের মধ্যে তার ছবি উঠে আসে ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনের কাভারে এবং সে থেকে তার স্বর্ণালী ক্যারিয়ারের পদযাত্রা শুরু হয়। ইউরোপের অন্যতম সেরা ফ্যাশন মডেল হিসেবে পরবর্তীতে আরো তিন ডজন ম্যাগাজিনের কাভারে তিনি উঠে আসেন। সেই বিখ্যাত অ্যানে স্কফাসের জীবনে সম্পদ, খ্যাতি এবং ইউরোপের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে এ্যাপার্টমেন্ট এসবের কোনটিই কমতি ছিল না। কিন্তু যে সুখের জন্য তিনি এ সমস্ত কিছুর পেছনে এতদিন ছুটছিলেন সে সুখ তার অধরাই ছিল।

যে ব্যক্তির পড়নে সবসময় আগে মূল্যবান রাজকীয় পোশাক থাকত সেই ব্যক্তির সাজসজ্জা এখন একদমই সাদামাটা। নেই কোন স্বর্ণালংকার কিংবা মেকাপ। পড়নে ৯ গজ দীর্ঘ একটি সাধারণ মানের শাড়ী। মাথায় থাকে ঘোমটা। এসব পরিবর্তনের মূলে রয়েছে কৃষ্ণভাবনা। কৃষ্ণভাবনার উচ্চতর আদর্শ পেয়ে অ্যানে স্কফাস এখন সম্পূর্ণ অন্যরকম। তার এ পরিবর্তন সম্পর্কে অ্যানে স্কফাস বলেন, ‘নারীরা আসলেই বুঝতে পারে না, প্রকৃত সৌন্দর্য্য নিহিত রয়েছে এই জ্ঞানের মধ্যেই যে, ‘আমি এই দেহ নয়, আমি আত্মা’। একজন মডেল হিসেবে আমার ছিল অনেক শুভাকাঙ্খী, ভালো কাজ, অঢেল অর্থ-বিত্ত, আভিজাত্য, ঐশ্বর্য। কিন্তু আমি সেই জীবনের কৃত্রিমতার মাঝে সবসময়ই অস্বস্তি অনুভব করতাম। মিডিয়াগুলোর দিনরাত ছায়ার মত লেগে থাকা সত্যিই অস্বস্তির কারণ।

১৯৭৩ সালে অ্যানে স্কফাস যখন মডেলিং এর জন্য এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাড়ি দিচ্ছিলেন, তখন তার সাথে প্যারিসের অরলি বিমানবন্দরে আচমকা সাক্ষাৎ ঘটে এক কৃষ্ণভক্ত মহিলার সঙ্গে। সেই ভক্তটি বলছিল যে, সে এসেছে একটি কৃষ্ণ মন্দির থেকে, যেখানে তিনি ভগবানের প্রতি প্রেমময়ী সেবা ভক্তিযোগ অনুশীলন করেন।

অ্যানে বলেন, “আমি আগে থেকেই যোগ অনুশীলন সম্পর্কে কিছুটা জানতাম এবং আমার অনুভূত হচ্ছিল সেই ভক্তটি একটি উচ্চতর জীবন আদর্শে লালায়িত। আমি ভক্তটিকে বললাম এটি আমার জন্যে নয়। কেননা এ যোগ অনুশীলনের জন্য যে সময়ের প্রয়োজন সেটি আমার কাছে নেই। আমাকে কাজের খাতিরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে হয়, ব্যস্ত থাকতে হয়। কিন্তু তিনি আমাকে ব্যাখ্যা করলেন যে, ভক্তিযোগ খুবই সরল এবং আমি সেটি যেকোন স্থানে, যে কোন সময় অনুশীলন করতে পারি। তিনি আমাকে একটি গ্রন্থ দিলেন এবং সে সাথে প্যারিস মন্দিরের ঠিকানা দিয়েছিলেন। আমি তার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম সেখানে একদিন যাব বলে। “দু’মাস পর আমি সেই মন্দিরে গিয়েছিলাম। তখন ভগবদ্গীতার ক্লাস চলছিল। সেখানে ত্রিশ জনের মত ভক্ত বসেছিল। আমিও বসলাম। পাঠক ভগবান গোস্বামী বলছিলেন কিভাবে মানুষ নিজেদেরকে দেহ হিসেবে গ্রহণ করে একে অপরকে সাদা-কালো, নারী-পুরুষ, ধনী-গরীব, হিন্দু-মুসলিম এভাবে সম্বোধন করছে আর হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ছে। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে তার এ গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো শ্রবণ করছিলাম। আমি দেখছিলাম যে ভক্তদের পোশাক কি সরল! এবং প্রত্যেকেই মেঝের উপর বসেছিল। “ক্লাসের পর আমি ভগবান গোস্বামীর কাছে গেলাম এবং তাকে বললাম আমি যোগ অনুশীলন করতে চাই। তিনি বলেন,
তিনি ব্যাখ্যা করলেন যে, ভগবানের নাম ভগবান থেকে ভিন্ন নয় এবং এই পবিত্র নাম জপ-কীর্তনের মাধ্যমে ভগবানের সাথে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হয়। অ্যানে তখন থেকেই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ অনুশীলন শুরু করলেন। হোটেল রুমে প্লেনে চড়ার সময় কিংবা কাজের বিরতিতে যখনই সময় পেতেন অ্যানে এ জপ অনুশীলন করতেন। সেটা কয়েক মিনিটের জন্য হলেও।’জপ আমাকে আমার খারাপ অভ্যাসগুলো ত্যাগ করতে সাহায্য করছিল। এটি ছিল বিস্ময়কর! আমি ১৩ বছর বয়স থেকেই ধুমপান করছিলাম। আমি ভাবতাম এখন আমি ধুমপান করতে যাচ্ছি, তার আগে এক মালা জপ সেরে নিই। এক মালা জপের পর ভাবতাম দু’মালাই করে নিই তারপর না হয় ধুমপান করব। দু’মালা শেষ করার পর আমার এত ভালো লাগত যে, আমার ধুমপানের নেশাটাই কেটে যেত। অ্যানের জীবনের সেসময় আরও কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল। শুরুর দিকে আমি খেলার ছলে জপ করতাম, কিন্তু কিছুক্ষণ ফাঁকে লোকচক্ষুর আড়ালে টেবিলের নিচে জপ করা কিংবা অন্যান্য মডেলদের মাঝে অবৈধ যৌনতা এবং নেশা করার বিরুদ্ধে প্রচার করা ইত্যাদি তার ক্রমোন্নতির লক্ষণ প্রকাশিত হচ্ছিল।

“আমি আমার মেয়ে বন্ধুদের কৃষ্ণ মন্দিরে নিয়ে যেতাম, কিন্তু সেগুলোর মাধ্যমে একটি গুজব ছড়াচ্ছিল যে, কৃষ্ণভাবনায় আমার অংশগ্রহণ শুধুমাত্র গণপ্রচারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। অবশেষে একদিন আমি ফোন করলাম আমার এজেন্টকে এবং তাকে বললাম আমার সব বুকিং বাতিল করতে কেননা আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি মন্দিরে অবস্থান করব।”

এরপর অ্যানে তিন বছর পর্যন্ত মডেলিং থেকে দূরে সরেছিলেন। “আমি মন্দিরের মেঝে পরিস্কার করতাম এবং বিগ্রহের জন্য ফুলের মালা তৈরি করতাম। তারপর একদিন আমি রান্না করেছিলাম এবং প্রত্যেকে তা পছন্দ করেছিল। তাই সে থেকে সারা বছর জুড়ে আমি প্রতিদিন শতাধিক ভক্তের জন্য রান্না করতাম।”

অন্যান্য ভক্তদের মত অ্যানে মন্দিরের যে কঠোর নিয়মকানুন তা অনুসরণ করত। ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠে স্নান করা এবং মন্দিরের দৈনন্দিন কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করা ছিল প্রতিদিনের অবধারিত নিয়মকানুন। সকালেই ১৬ মালা জপের প্রায় সম্পন্ন করতেন। এরপর অ্যানে ভগবদ্গীতা যথাযথ গ্রন্থটিকে ডেনমার্কের ভাষায় রূপান্তরের কাজ শুরু করেন। এভাবে তাকে নিয়ে মিডিয়াতে অনেক তোলপাড় শুরু হল। ‘Cover girl chooses krishna’ ইত্যাদি শিরোনামে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন ছাপানো হত। ১৯৭৪ সালে অ্যানে প্যারিসের ভক্তদের সাথে ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান পরিভ্রমন করেন। পরবর্তীতে শ্রীল এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে নাম হয় শতরুপা দেবী দাসী। তিনি নেশা, আমিষাহার, জুয়া-খেলা, এবং অবৈধ যৌনসঙ্গ ইত্যাদি সম্পূর্নরূপে পরিত্যাগ করেন। পরবর্তীতে যখন তিনি মডেলিংয়ের পেশায় আবার জড়িত হন তখনও তিনি এ চারটি আদর্শ দৃঢ়ভাবে পালন করেন। তার উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি ভক্ত ছেলেমেয়েদের স্কুল খোলেন।

তিনি বলেন, “একবার আমি ৪ মিলিয়ন ডলারের ডায়মন্ড পড়ে মডেলিং করছিলাম। তখন সিকিউরিটি গার্ডস, স্টুডিওর লোকজন প্রত্যেকেই এ নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিল এবং নার্ভাস ছিল কেউ যদি এটি চুরি করার চেষ্টা করে। আমি অতি সতর্কতার সঙ্গে এক জায়গায় ঠাঁই বসেছিলাম। তখন ভাবছিলাম হায়! ডায়মন্ডগুলো খুবই সুন্দর কিন্তু তা শুধু অর্থের অপচয়। যারা পড়ে তাদেরকে বিপদের সঙ্গেই কাটাতে হয়। পড়ে ভাবছিলাম এই জীবনে আমাদের এমন অনেক সম্পদ থাকতে পারে কিন্তু এ সব ডায়মন্ডের মতই আমরা কিছু সময় পড়ে থাকি এবং পরে আমাদের তা ছেড়ে চলে যেতে হয়। সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। আমি মডেলিং করেছিলাম Dior gown, Sherrer haute couture, St. Laurent originals ইত্যাদি। কিন্তু এসব মডেলিং-এ আমি যা পড়তাম তা আমাকে দিয়ে দিতে হত। এ জগতে কৃষ্ণের শক্তির কিছু অংশ আমরা ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছি, যেমনটি এ শরীর, কিন্তু সেটি যখন পুরানো হবে তখন আমাদেরকে তা পরিত্যাগ করতে হবে। অ্যানে স্কফাসের এ নতুন জীবন ধারা সম্পর্কে জানার জন্য লোকেরা অনেক আগ্রহী হত।

“আমি তাদেরকে উৎসাহ দিতাম শুধুমাত্র হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করতে। এর জন্যে তাদের কোন ক্ষতি হবে না, বরঞ্চ লাভই হবে। এর জন্য তাদের কোন মূল্যও দিতে হবে না। কিন্তু এর মাধ্যমে তারা সর্বঅবস্থাতেই সন্তুষ্ট থাকবে।” আসলে, জাগতিক সফলতা হল প্রকৃতপক্ষে ব্যর্থতা কেননা এটি কখনো সন্তুষ্টি নিয়ে আসে না। আপনি কতটা সফল এটি কোন অর্থবহ না যদি না আপনার জীবনে কৃষ্ণ না থাকে, এই হল ব্যাপার। কৃষ্ণ ছাড়া সবকিছু মাথাব্যথা। বারবারা নামে এক কিশোরী আমার সাথে প্রায় স্থানে ভ্রমণ করত। সে ছিল খুব সুন্দরী এবং সে একজন মডেল হতে চাইত। তাই আমি তাকে সমস্ত মডেলদের সঙ্গ করাতাম যারা কিনা জাগতিকভাবে খুবই সফল এবং এরপরে সে মাথা ঝাকিয়ে বলে ‘তারা সুখী নয়’! সে বলে, “তারা সবাই সবসময়ই উদ্বিগ্ন’ সে উপলব্ধি করতে শুরু করেছিল যে, বাইরে থেকে লোকেরা এদেরকে যা মনে করে আসলে তারা তা নয়। একজন মডেল হওয়ার পর আপনার সময়গুলো কাটে উদ্বিগ্নতার মধ্য দিয়ে, যেখানে পরবর্তী মাসের কাভার কেমন হবে, মিডিয়াগুলোর ধারাবাহিক উৎপাত, সন্ত্রাসীদের উৎপাত ইত্যাদি উদ্বিগ্নতা। কিন্তু যদি কৃষ্ণভক্ত হোন তখন আপনার জীবন হল উন্নত বা মহান  (Sublime)”। হরে কৃষ্ণ।

  • Newer

    প্রকৃত সৌন্দর্যের খোঁজে: মিস ডেনমার্ক থেকে শ্রীকৃষ্ণ চরণে

Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)